খুলনায় এপিসি স্কুলের কম্পিউটার অপারেটরের বিরুদ্ধে সাড়ে ১৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্ট

ওষুধের দোকানের আড়ালে টাকা নেওয়ার অভিযোগ, তদন্তে ৪০৬/৪২০ ধারার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
খুলনার লবণচরায় অবস্থিত এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর ও ‘মেসার্স এম.এ ফার্মেসী’র স্বত্বাধিকারী মো. মমিনুর রহমান ওরফে মমিন হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের কথা বলে লাখ লাখ টাকা নেওয়া এবং তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্তে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওষুধের ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং পাইকারি ওষুধ কেনার কথা বলে পরিচিত কয়েকজনের কাছ থেকে টাকা নেন মমিনুর। বিনিময়ে ব্যবসার মুনাফা থেকে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরবর্তীতে টাকা ও লভ্যাংশ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, একটি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণের পর মমিনুর রহমানকে কারাগারে পাঠানো হলেও তার বিরুদ্ধে কর্মস্থল থেকে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি শিক্ষা দপ্তরকেও জানানো হয়নি বলে জানিয়েছেন খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
মনিরুলের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কয়রা উপজেলার বগা গ্রামের ব্যবসায়ী মো. মনিরুল ইসলামের সঙ্গে মমিনুর রহমানের পূর্বপরিচয় ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে মমিনুর তার ওষুধ ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ওষুধ কেনার কথা বলে ব্যবসায়িক মুনাফার ৫ শতাংশ দেওয়ার আশ্বাস দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত তিন দফায় মনিরুল ইসলামের কাছ থেকে মোট ৭ লাখ টাকা নেন মমিনুর। এর মধ্যে নগদ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের কথা মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে নির্ধারিত সময় পার হলেও লভ্যাংশ বা মূল টাকা ফেরত না দেওয়ায় মনিরুল ইসলাম টাকা ফেরত চান। কিন্তু মমিনুর টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং যোগাযোগ বন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
লিগ্যাল নোটিশের পর মামলা
পাওনা টাকা ফেরত না পাওয়ায় মনিরুল ইসলাম আইনজীবীর মাধ্যমে গত বছরের ৬ নভেম্বর মমিনুরের কর্মস্থল এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে তাকে লিগ্যাল নোটিশ দেন। একইসঙ্গে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকেও জানানো হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নোটিশের পরও টাকা ফেরত না দেওয়ায় গত বছরের ১৮ নভেম্বর কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মমিনুর রহমানকে আসামি করে মামলা করেন মনিরুল ইসলাম।
আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুলনার এসআই এস এম পলাশ হোসেন মামলাটি তদন্ত করেন। সরেজমিনে তদন্ত, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ বিভিন্ন নথি পর্যালোচনার পর দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
পাওনাদারের বিরুদ্ধে করা মামলাও তদন্তে টেকেনি
মামলার নথি অনুযায়ী, মমিনুর রহমান পরবর্তীতে পাওনাদার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে খুলনা মহানগর হাকিমের আমলী আদালত, লবণচরায় একটি মামলা করেন।
তবে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এসআই মো. আজগর হোসেনের তদন্তে ওই মামলার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
আল আমিনের কাছ থেকেও সাড়ে ৭ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে আরও একটি মামলা হয়েছে। কয়রা উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের মো. আল আমিনের অভিযোগ, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে পাইকারি ওষুধ কেনার কথা বলে তার কাছ থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন মমিনুর।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ মে নগদ ৪ লাখ টাকা এবং ২৩ মে মমিনুর রহমানের নামে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জয়গীর মহল কয়রা শাখার হিসাবে আরও সাড়ে ৩ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়, টাকা নেওয়ার পর নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো লভ্যাংশ বা মূল টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে টাকা চাইলে মমিনুর টালবাহানা করেন এবং একপর্যায়ে টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান।
পুলিশি তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা
টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আল আমিন আইনজীবীর মাধ্যমে গত বছরের ১৯ নভেম্বর মমিনুরকে লিগ্যাল নোটিশ দেন। এরপরও টাকা ফেরত না দেওয়ায় তিনি কয়রার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন।
আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করেন কয়রা থানার এসআই মো. লুৎফর রহমান। তিনি সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ এবং অগ্রণী ব্যাংকের হিসাব বিবরণী যাচাই করেন।
তদন্ত শেষে মমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে গত ২১ মার্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে, পরে জামিন
মনিরুল ইসলামের করা মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর মমিনুর রহমান উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন বলে জানান মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জি এম আল-আমিন।
তিনি জানান, গত ২৪ আগস্ট উচ্চ আদালতের জামিনের মেয়াদ শেষ হলে মমিনুর কয়রার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠান।
বাদী মনিরুল ইসলামের দাবি, পরবর্তীতে পাওনা ৭ লাখ টাকার বিপরীতে মাত্র দেড় লাখ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং মমিনুর জামিন পান। তবে এ বিষয়ে আদালতের আদেশ ও মামলার বর্তমান আইনগত অবস্থাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
মনিরুল আরও অভিযোগ করেন, মমিনুরের শ্বশুর ইব্রাহিম সানা কয়রার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার মমিনুরের
প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে মমিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য না দিয়ে তিনি কেন তাকে ফোন করা হয়েছে, তা জানতে চান এবং ‘যা পারেন তাই করেন’ বলে মন্তব্য করেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, একটি মামলায় মমিনুর রহমান কারাগারে গেলেও তার কর্মস্থল এপিসি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি বিষয়টি শিক্ষা দপ্তরকেও জানানো হয়নি।
এ বিষয়ে খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান বলেন, কোনো চাকরিজীবী কারাগারে গেলে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার বিধান রয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ কেন মমিনুরকে সাময়িক বরখাস্ত করেনি এবং শিক্ষা দপ্তরকে বিষয়টি জানায়নি, তা খতিয়ে দেখা হবে। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত মমিনুর রহমান আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন কি না, তা আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়।









