খুলনা

খুলনায় অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের দৌরাত্ম্য

নিজস্ব প্রতিবেদন

খুলনায় অবৈধ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের দৌরাত্ম্য

 

মহানগরে লাইসেন্সহীন ১৯, জেলায় আরও ২৩ প্রতিষ্ঠান

 

বিভাগজুড়ে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগণস্টিক ২৮০

 

‘অদক্ষ জনবল, ভুয়া রিপোর্ট, অনুমোদনহীন যন্ত্রপাতি

বছরের পর বছর তদারকি নেই, অভিযানে যাচ্ছে ¯^াস্থ্য বিভাগ’

কামরুল হোসেন মনি

খুলনায় বেসরকারি ¯^াস্থ্যসেবা খাত এখন কার্যত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ বাণিজ্যের এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে| লাইসেন্স ছাড়া ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা, অদক্ষ ও অননুমোদিত কর্মচারী দিয়ে রোগ নির্ণয়, অনুমোদনহীন যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ভুয়া ও ভুল রিপোর্ট প্রদান, ¯^াস্থ্যবিধি লঙ্ঘন এবং লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই বছরের পর বছর চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ অনিয়ম অভিযোগ রয়েছে|

খুলনা বিভাগীয় ¯^াস্থ্য পরিচালক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগে বর্তমানে ৮৯৭টি ক্লিনিক ও ১ হাজার ৪১৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে| এর মধ্যে ১১২টি ক্লিনিক ও ১৬৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোনো ˆবধ লাইসেন্স নেই| অর্থাৎ মোট ২৮০টি প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদন ছাড়াই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে|

¯^াস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্রের দাবি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভাগের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিবান্ধব সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণেই খুলনা বিভাগে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার বছরের পর বছর নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল| লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি| বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় তারা নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে| সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিভাগীয় ¯^াস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ মোশারেফ হোসেন ইতোমধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলির উদ্যোগ নিয়েছেন| পাশাপাশি জন¯^ার্থে ¯^াস্থ্য বিভাগের তদারকি ও জবাবদিহিতা জোরদারের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে|

মহানগরীতে অবৈধ ১৯ প্রতিষ্ঠান

জানা গেছে, খুলনা মহানগরীতে বর্তমানে লাইসেন্সধারী ক্লিনিক রয়েছে ১০৮টি| তবে এর বাইরে আরও ৭টি ক্লিনিক অনুমোদন ছাড়াই রোগী ভর্তি, অপারেশন ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে| একইভাবে ১৬৯টি লাইসেন্সধারী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাশাপাশি ১২টি প্রতিষ্ঠান কোনো ˆবধ অনুমোদন ছাড়াই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের কাজ করছে| অর্থাৎ মহানগরীতেই লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯টিতে|

উপজেলাগুলোতে আরও ভয়াবহ চিত্র

খুলনা সিভিল সার্জন দপ্তরের সূত্রে মতে, খুলনার ৯ উপজেলায় ৬৩টি লাইসেন্সধারী ক্লিনিকের বিপরীতে ৮টি ক্লিনিক এবং ১০৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিপরীতে ১৫টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে| সব মিলিয়ে খুলনা জেলায় মহানগরী ও উপজেলা পর্যায়ে লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২টিতে|

রূপসা উপজেলায় লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে রয়েছে রূপসা প্যাথলজিক্যাল সেন্টার, আরাফাত ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং আজকের সারাদেশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার| একই উপজেলায় আরাফাত হাসপাতাল ও আজকের সারাদেশ হাসপাতালও অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে| ডুমুরিয়ায় ডক্টরস ল্যাব ডায়াগনস্টিক, রাবেয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, খুলনা রিজিওনাল ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কনসালটেশন এবং কেয়ার ডিজিটাল মেডিকেল সার্ভিসেস লাইসেন্স ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে| একই উপজেলার রাবেয়া ক্লিনিক এবং খুলনা রিজিওনাল ক্যান্সার হাসপাতালের বিরুদ্ধেও অনুমোদন ছাড়া পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে| পাইকগাছায় মা ও শিশু ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টার-চাঁদখালী, সতীশ ডায়াগনস্টিক-গড়াইখালী ও কোহিনূর ডায়াগনস্টিক-গড়াইখালী অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে| একই উপজেলার পাইকগাছা মা ও শিশু সেবা সদন, রংধনু ক্লিনিক এবং মায়েশা ক্লিনিকও লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে| এ ছাড়া দিঘলিয়ায় দিঘলিয়া ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, পথের বাজার সার্জিক্যাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং শফিন ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টার; তেরখাদায় ¯^প্ন সিঁড়ি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফুলতলায় ডিল্যাব কনসালটেশন অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে|

জানা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণহীন কর্মচারী দিয়ে রোগ নির্ণয়ের কাজ করানো হচ্ছে| কোথাও কোথাও টেকনোলজিস্ট ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হচ্ছে| এমনকি অনুমোদনহীন ও পুরোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে| এতে রোগীরা ভুল চিকিৎসার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন| নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে চিকিৎসক দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে চিকিৎসক পাওয়া যায় না| টেকনিশিয়ান সংকট তো আছেই, কিছু জায়গায় অদক্ষ লোকজন দিয়ে পরীক্ষার কাজ করানো হচ্ছে|”

বিভাগজুড়ে ভয়াবহ চিত্র

খুলনা বিভাগীয় (পরিচালক) ¯^াস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে সাতক্ষীরা ও যশোরে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক| সাতক্ষীরায় ৩২টি ক্লিনিক ও ৫২টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে| যশোরে রয়েছে ৪৩টি ক্লিনিক ও ২৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার| এ ছাড়া মাগুরায় ১১টি ক্লিনিক ও ২১টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কুষ্টিয়ায় ৫টি ক্লিনিক ও ২৫টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাগেরহাটে ২টি ক্লিনিক ও ৭টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং মেহেরপুরে ২টি ক্লিনিক ও ৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে| নড়াইলে ২টি ক্লিনিক এবং ঝিনাইদহে ৩টি লাইসেন্সবিহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্য পাওয়া গেছে| চুয়াডাঙ্গায় লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান না থাকলেও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ৪টি ক্লিনিক ও একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বন্ধের জন্য পত্র জারি করা হয়েছে| ¯^াস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ইতোমধ্যে ২৯টি ক্লিনিক ও ৩৯টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বন্ধের জন্য নোটিশ জারি করা হয়েছে| একই সঙ্গে ৪২টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ রয়েছে|

খুলনা বিভাগীয় ¯^াস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জন¯^াস্থ্য সুরক্ষা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে খুব শিগগিরই বিভাগজুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে| লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন|

¯^াস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত অভিযান ছাড়া এই অব্যবস্থাপনা বন্ধ করা সম্ভব নয়| অন্যথায় অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দৌরাত্ম্যে জন¯^াস্থ্য আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে|

খুলনা বিভাগীয় পরিচালক (¯^াস্থ্য) ডা. শেখ মোশারেফ হোসেন বলেন, “আমি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছি| লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে খুব শিগগিরই বিভাগজুড়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে| জন¯^ার্থে ¯^াস্থ্য বিভাগকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে| অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে|”… 

খুলনা সিভিল সার্জন ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, “উপজেলা পর্যায়ের লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে| অভিযোগ পাওয়া মাত্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে|

#দেশবাংলানিউজ

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button