মূল ধারার রাজনীতিতে ৫০ বছরে পা রাখলেন বরেণ্য রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ

মূল ধারার রাজনীতিতে ৫০ বছরে পা রাখলেন বরেণ্য রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ রাজনীতিতে ৫০ বছরে পা রাখলেন আজ। তিনি ১৯৭০ সালের ২ জুন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। এর আগে তিনি ১৯৬০-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে সংগঠনের সর্বোচ্চ পদ সভাপতি পর্যন্ত নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর নির্বাচিত সহ-সভাপতিও (ভিপি) ছিলেন তিনি।

আওয়ামী লীগে দীর্ঘ ৫০ বছরের রাজনীতির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এই জীবনে অনেক পেয়েছি। এখন আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমার রাজনৈতিক জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য লাভ, তাঁর স্নেহ, মমতা ও ভালোবাসা।

আমার জীবন সার্থক ও ধন্য। যা পেয়েছি, তা কখনো কল্পনাও করিনি। অজপাড়া গাঁয়ের একজন সাধারণ ছেলে হয়ে এত কিছু পাব ভাবতেও পারিনি। এখন আমার একটাই চাওয়া আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে ইজ্জত-সম্মানের সঙ্গে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেওয়া। তিনি বলেন, আমার রাজনীতির শ্রেষ্ঠ দিন হচ্ছে, ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এদিন তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক মানুষের সামনে কৃতজ্ঞ বাঙালির জাতির পক্ষে কৃতজ্ঞচিত্তে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন।

১৯৬০ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি তোফায়েল আহমেদের। প্রথমে ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক এবং কলেজের হোস্টেল অশ্বিনী কুমার হলের ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হন ১৯৬২ সালে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৬-৬৭-তে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হন

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ৬ দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৬-এর ৮ মে থেকে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৩৩ মাস কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র সব রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা বাংলায় তৃণমূল পর্যন্ত তুমুল গণআন্দোলন গড়ে তোলে। যে আন্দোলনে আসাদ, মতিউর, মকবুল, রোস্তম, সার্জেন্ট জহুরুল হক, ড. শামসুজ্জোহাসহ অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভার সভাপতি হিসেবে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে জাতির পিতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তিনি। ১৯৬৯-এ তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ২ জুন তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার উপস্থিতিতে ছিল এ যোগদান। ছাত্রলীগের রাজনীতিসহ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ৬০ বছর, আর শুধু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে তাঁর। অর্থাৎ অর্ধ শতাব্দী আওয়ামী লীগে রাজনৈতিক জীবন পার করলেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলত খাঁ-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তিনি ছিলেন ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন।
১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তোফায়েল আহমেদকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে একই মর্যাদায় রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী মনোনীত হন তোফায়েল আহমেদ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম জাতীয় কাউন্সিলে তোফায়েল আহমেদ দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ওই কমিটিতে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকান্ডের পরপরই তোফায়েল আহমেদকে প্রথমে গৃহবন্দী ও পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দী অবস্থায় তাঁকে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখা হয়। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তোফায়েল আহমেদ কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি সফলভাবে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন (তখন একজন মাত্র সাংগঠনিক সম্পাদক পদ ছিল)। ১৯৯২-এ তোফায়েল আহমেদ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন এবং দীর্ঘ ১৮ বছর এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বর্তমানে দলের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য তিনি। রাজনৈতিক জীবনে স্বৈরশাসক জিয়া, এইচ এম এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলে তিনি প্রায় ৫ বছর কারাগারে জীবন কাটিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে তিনি কখনো ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, কাশিমপুর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ছিলেন।

 

দেশ বাংলা নিউজ

দেশ বাংলা নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *